২০২৪ সাল

চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য ইউএইর

গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন নতুন অনিশ্চয়তা যোগ হয়েছে। বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাণিজ্যিক মেরুকরণকে আগের তুলনায় গতিশীল করেছে।

গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন নতুন অনিশ্চয়তা যোগ হয়েছে। বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাণিজ্যিক মেরুকরণকে আগের তুলনায় গতিশীল করেছে। এ ধরনের অনিশ্চয়তা ও চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রেখেছে দেশটির রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

২০২৪ সালে প্রায় ১ দশমিক ৪২ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য করেছে ইউএই, যা ২০২১ সালের তুলনায় ৪৯ শতাংশ বেশি। ওই বছর দেশটি ২ লাখ ২২ হাজার কোটি দিরহামের পণ্য ও ৬৪ হাজার ৬৬০ কোটি দিরহামের সেবা রফতানি করে। উল্লেখিত সময় দুই খাতে আমদানির জন্য আরব আমিরাত খরচ করেছে যথাক্রমে ১ লাখ ৯৮ হাজার কোটি দিরহাম ও ৩৮ হাজার ৯৪০ কোটি দিরহাম। ফলে দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৪৯ হাজার ২৩০ কোটি দিরহাম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতিতে উদ্ভাবন, উদার নীতি, বৈশ্বিক সংযোগ এবং আধুনিক অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান আরো মজবুত করেছে। ডব্লিউটিওর সাম্প্রতিক তথ্য এরই প্রতিফলন।

উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো সাম্প্রতিক দশকে জ্বালানি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। এ বৈচিত্র্যায়ণের পথে অগ্রগণ্য দেশ ইউএই। দেশটি এখন নতুন নতুন উদ্যোগ ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এছাড়া দেশটিতে ব্যবসা, বিনিয়োগবান্ধব নীতি বিদেশীদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট করছে। বৈশ্বিক পুঁজির অন্যতম গন্তব্য হিসেবে পরিচিত পাচ্ছে দুবাই, আবুধাবি ও শারজা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও আঞ্চলিক দপ্তর স্থাপনে এসব শহরকে প্রাধান্য দিচ্ছে।

একাধিক অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, নীতি শিথিলায়নের সুযোগে আরব আমিরাতে বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ প্রবেশ করছে, যা এখানকার রিয়েল এস্টেট, প্রযুক্তিসহ নানা খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে। এছাড়া পণ্য রফতানি বাবদ প্রাপ্ত অর্থ নিজ দেশে না নিয়ে কর স্বর্গ-খ্যাত ইউএইতে স্থানান্তর করছেন অনেক বিদেশী।

ডব্লিউটিওর দেয়া তথ্যানুসারে, আরব আমিরাত বর্তমানে বিশ্বে পণ্য রফতানিতে ১১তম এবং সেবা রফতানিতে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালে মধ্যপ্রাচ্যের মোট পণ্য রফতানির ৪১ দশমিক ৪ শতাংশের হিস্যা ছিল দেশটির।

নতুন এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর মাইক্রো ব্লগিং প্লাটফর্ম এক্সে বার্তা দিয়েছেন আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাকতুম। তিনি বলেন, ‘একটি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জপূর্ণ বিশ্বে আমিরাত শুরু থেকেই বেছে নিয়েছে উন্মুক্ততা, সংযোগ ও বাণিজ্য এবং পুঁজি ও জনগণের মুক্ত চলাচলের নীতি। আজ অঞ্চলটি পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সেতুবন্ধ এবং একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।’

অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যায়ণের অংশ হিসেবে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে ইউএই। ২০২৪ সালে এ ধরনের উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। এ সময় ভারত, ইসরায়েল, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, জর্জিয়া, কোস্টারিকা ও মরিশাসসহ একাধিক দেশের সঙ্গে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেটস বা সিইপিএ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে ইউএই। আরো কয়েকটি দেশের সঙ্গে এ চুক্তি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কলম্বিয়া ও মালয়েশিয়া।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গতিশীলতার লক্ষ্যে একাধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে আরব আমিরাত। এরই মধ্যে এসব উদ্যোগের সুফল দৃশ্যমান হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে আমিরাতের অর্থনীতি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। চলতি বছরে ৪ দশমিক ৭ এবং ২০২৬ সালে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

এছাড়া ডব্লিউটিওর প্রতিবেদনে জ্বালানি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে ইউএইর সরে আসার চিত্র পাওয়া যায়। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে, গত বছর দেশটি ১৯ হাজার ১০০ কোটি দিরহাম বা প্রায় ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সেবা রফতানি করেছে, যা মোট সেবা রফতানির ৩০ শতাংশ। যেখানে আমিরাতের বৈশ্বিক অবস্থান ২১তম। এ সময় তথ্য সেবায় ১৪ শতাংশ, পর্যটনে ১৩, কম্পিউটার সেবায় ১২, আর্থিক সেবায় ৯ এবং বীমা, পরিবহন ও মেধাস্বত্বসংক্রান্ত সেবায় ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। মোট সেবা বাণিজ্যে ১ লাখ ৩ হাজার ৬০০ ডলারের বেশির ভাগ অংশই ছিল রফতানি। অন্যদিকে সেবা আমদানিতে খরচ করেছে ৩৮ হাজার ৯৪০ কোটি দিরহাম।

২০২৪ সালে বৈদেশিক বাণিজ্যে রমরমা অর্জনের পর আরব আমিরাত চলতি বছর কিছু ক্ষেত্রে অভিঘাতের মুখোমুখি হতে পারে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কভিত্তিক বাণিজ্যনীতির কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা বেড়েছে। ডব্লিউটিও এরই মধ্যে জানিয়েছে, বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। যদিও গত অক্টোবরে ২ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল একই সংস্থা।

অবশ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার বলছে, ইউএইর উল্লেখিত সাফল্যের পেছনে রয়েছে উদ্ভাবন ও বৈচিত্র্যায়ণ কৌশল, যা চলতি বছরের পণ্য বাণিজ্য হ্রাসের পূর্বাভাস মোকাবেলায় দেশটির অবস্থান প্রতিফলিত করে।

২০২৪ সালে মধ্যপ্রাচ্যের অর্জিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৬ শতাংশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল ইউএইর। চলতি বছরের জন্য দেয়া ৩ দশমিক ২ এবং ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশা করছেন আরব আমিরাতের নীতিনির্ধারকরা।

আরও